Saturday, January 31, 2015

একদা এক মেয়ে টিউশনির পড়ানোর অভিজ্ঞতা।। :D :P


 এই মাসের শেষের দিকে একটা টিউশনি পাইলাম ক্লাস এইটের স্টুডেন্ট। :D

স্টুডেন্ট মেয়ে, আর বেতন ৭ হাজার, না যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। :P :D

যে সারে টিউশনি ঠিক করে দিল, সেই সার আগে ভাগে সতর্ক করে দিল '' ঐ পড়াবি ভালো কথা, কিন্তু দেখিস মেয়ে কিন্তু সুবিধার না। '' মাথা নাড়িয়ে সুবোধ বালকের মত জি সার বলে সেইদিন ঐখান থেকে বিদায় নিয়েছিলাম।

যাই হোক ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গেলাম প্রথম দিন।। :D

টিউশনির প্রথম দিনঃ

এর আগে গার্জিয়ানের সাথে কথা হলেও স্টুডেন্টের সাথে কথা হয়নি। প্রথম দেখাতেই স্টুডেন্টকে পছন্দ হয়ে গেল। দেখেই মাথায় একটা কথা আসল '' এই মেয়ে এতো জোস কেন ''

প্রথম কর্তাবার্তা শুরু করলাম এই বলেঃ

আমিঃ তোমার নাম কী?
স্টুডেন্টঃ আম্মু বলে নাই? :o
আমিঃ না তো? O.o
স্টুডেন্টঃ ও, আমার নাম নওরিন। :)
আমিঃ আচ্ছা, তো এইবার জেএসসি দিবা তাহলে?
স্টুডেন্টঃ এইটে যেহেতু উঠছি, দিব তো অবশ্যই। সার আপনার নাম কি?
আমিঃ (একটু ভ্যাবাছ্যখা খেয়ে) আমার নাম সাজিদ।
স্টুডেন্টঃ সার একটা কথা বলব মাইন্ড না করলে? :D
আমিঃ হুম বলো বলো, ফ্রীলি বলো কোন সমস্যা নেই। :)
স্টুডেন্টঃ সার এখন তো তেমন শীত পরছে না, আপনি জ্যাকেট পড়ে আসলেন কেন?? :D
আমিঃ (পুরো নার্ভাস হয়ে গেলাম, একটু গম্ভির হয়ে) আচ্ছা এইসব পরে হবে এইবার চলো কি পড়া আছে দেখি।।
স্টুডেন্টঃ (মেয়ে মুচকি হেসে) ওকে সার। :)

সেইদিন আল্লাহর রহমতে আর কোন বেকা তেরা প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয় নাই, কিন্তু একটা জিনিস বুঝে গেলাম মেয়েটা সত্যি একটা জিনিস। :(

২য় দিনঃ

আমিঃ কি অবস্তা?
স্টুডেন্টঃ ভালো, সার আজকেইও জ্যাকেট। :o
আমিঃ আরেহ পিকুলিয়ার, আমি জ্যাকেট পরলে তোমার সমস্যা কি? :/
স্টুডেন্টঃ না সার, আপনি এই গরমেও সারাদিন দেখি জ্যাকেট পড়ে থাকেন কিভাবে?? :/
আমিঃ এখন মাঘ মাস, আর মাঘ মাসে শীত থাকে, আর আমার যাওয়ার সময় শীত লাগে বলেই জ্যাকেট পরি। তোমার ঐ কথা চিন্তা করতে হবে না। এখন পড়া নাও। :/
স্টুডেন্টঃ ওকে। :D

এরপর পড়াচ্ছিলাম ঠিকভাবেই। ৫-১০ মিনিট পরে হটাৎ করে মেয়েটা বলে উঠেঃ

স্টুডেন্টঃ সার, দরজাটা বন্ধ করে দিয়?? ;)
আমিঃ এ্যা? না না কোন দরকার নেই, যেমন আছে তেমনই থাক, দরজা লাগানো লাগবে না। :o
স্টুডেন্টঃ সার, দরজা খোলা থাকাটা কিরকম অড না? :/
আমিঃ কোন অড না, একটা মেয়ে পড়ানোর সময় দরজা বন্ধ করাটা অড, বুঝছো??
স্টুডেন্টঃ আম্মু কিছু মনে করবে না তো। :P
আমিঃ তারপরো কোন দরকার নেই। :/
স্টুডেন্টঃ ওকে সার। :D :P

ওইদিনও আর কোন কাহিনী করে নাই, যদিও পড়ার মাঝখানে মাঝখানে মুচকি হাঁসি অব্যাহত ছিল। :/ :(

কি বুঝে এই মেয়ে এতো হাসে আমি বুঝি না।।

৩য় দিনঃ

আজকে আর পড়া তেমন পড়াতেই পারিনি, মেয়ের পড়ার চেয়ে বেশি ইন্টারেস্ট অন্য দিকে। ;) :P

আজকে হটাৎ করে বলে উঠলোঃ

স্টুডেন্টঃ সার আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে?? :P :D
আমিঃ (থতমত খেয়ে) না তো? আর এইসব কি, তোমাকে আসছি পড়াতে, তুমি জিজ্ঞাস করো, আমার গার্লফ্রেন্ড আছে নাকি?? ঐইগুলাতো ভালো না। :/
স্টুডেন্টঃ সার আপনি রিয়েক্ট করছেন কেন? এমনিতেই জিজ্ঞাস করলাম, এতো বছর পড়ালেখা করলেন গার্লফ্রেন্ড তো নিশ্চই আছে, আর আমি তো বাচ্চা না যে বলা যাবে না। :D
আমিঃ তুমি সব কিছু একটু বেশি বুঝো। :/
স্টুডেন্টঃ সার আপনি না বলতে চাইলে থাক, কিন্তু বেশি বুঝো মানে কি? :/
আমিঃ আচ্ছা যাও, নেই। :/
স্টুডেন্টঃ আমি জানতাম থাকবে না। :D :P
আমিঃ মানে?? :/
স্টুডেন্টঃ আপনি যে রকম করেন, আপনার গার্লফ্রেন্ড থাকবে কেমনে?? :v
আমিঃ তুমি এই পিচ্চি মেয়ে হয়ে এতো আজাইরা কথা বলো কেন??
স্টুডেন্টঃ সার, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা জিজ্ঞাস করবেন না?? :D :P
আমিঃ আমার এইসবে কোন ইন্টারেস্ট নেই। তুমি পড়াটা পড়বা প্লিয। :/
স্টুডেন্টঃ সার আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আমার বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা তা জানতে আপনার অনেক ইন্ট্রেস্ট। :P :D
আমিঃ নওরিন তুমি পড়বা, না আমি চলে যাব। :/
স্টুডেন্টঃ আচ্ছা আচ্ছা সার পড়তেছি। :D

শেষ পর্যন্ত আজকে এই মেয়েক পড়িয়ে কেমনে বের হলাম খোদা জানে। এর মাঝখানে আরো বহুত প্রশ্ন করছিল এই নিয়ে, তা আর এইখানে বললাম
না।। বললে মান ইজ্জত যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।। :/

মেয়েটা যে সাংঘাতিক জিনিস, ১ মাস পড়ালে কাহিনী হয়ে যাবে শিউর, এরই মধ্যে আজকে আবার ২ বার ফোনও দিয়ে দিয়েছে পড়া না বোঝার অযুহাতে। :/

এই হচ্ছে আমার মেয়ে পড়ানোর টিউশনি এক্সপেরিয়েনস, ইদানিংকার মেয়েরা যে এতো বদ, তা এই মেয়েকে না পড়ালে সত্যি বুঝতাম না।। :(

আচ্ছা আমার ব্লগ রিডারদের মধ্যে এরকম সাংঘাতিক মেয়ে পড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এরকম কেউ আছেন নাকি?? থাকলে কমেন্টে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করিয়েন।। :D

Friday, December 12, 2014

গুগল ক্রমকে সাজিয়ে নিন বাংলাদেশের পতাকার আদলে।। :)


 ডিসেম্বর মাস এলেই আমরা দেখি আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমটা মনে হয় একটু বেড়েই যায়।। কত জনে কত কিছু করে, অনেকে ফেইসবুকের প্রোফাইল পিকচার চেইঞ্জ করে, কাভার পিকচার চেইঞ্জ করে আরো কত কি।।

কিন্তু একটাবার কেউ চিন্তা করেছেন আপনার ব্যাবহার করা গুগল ক্রম ব্রাউজারের থিমটা যদি আমাদের এই বাংলাদেশের পতাকার থিমে পরিবর্তন করা যায়??
আইডিয়াটা আসলে দিয়েছে আমাকে আমার এক বড় আপু, তার আইডিয়া থেকেই বানিয়ে ফেললাম গুগল ক্রমের জন্য এই থিমটা।

হতে পারে আপনার ইউজ করা থিমের মত আহামরি কিছু না, কিন্তু দেশের পতাকার আদলে গড়া একটা থিম তো তাই না??

ব্যাবহার করে দেখতে পারেন, আশা করি ভালো লাগবে।

থিম লিংকঃ http://www.themebeta.com/node/87902

এইবার বলে দিয় কিভাবে থিমটা আপনার গুগল ক্রমে ইন্সটল করবেন।।

প্রথমে উপরের দেয়া লিংকে ক্লিক করুন, ক্লিক করার পর থিম এপ্লাই করার পেইজ আসবে।। এইবার Apply তে ক্লিক করুন, অটোম্যাটিকালি থিমটা ডাউনলোড হয়ে যাবে, আর একটি থিমটা এপ্লাই হয়ে যাবে।।

এই থিমটা বানিয়ে আমার কোন লাভ হয়নি বা হবে না,  বিজয়ের মাসে কিছু মানুষের ব্রাউজারে হলেইও আমি আমার দেশের পতাকাকে  তুলে আনতে পেরেছি, এই আমার সার্থকতা।।
এখন আপনি আপনার ব্রাউজারে নিজের দেশের পতাকাকে স্থান দিবেন, কি দিবেন না, এই সিদ্ধান্ত আপনার।।

ভালো থাকবেন সবাই।।

ও আর একটা কথা পোস্টটি ভালো লাগলে প্লিয বন্ধুদেরকে শেয়ার করে ব্যাপারটা জানাতে ভুলবেন না, আসেন এই বিজয়ের মাসে গুগল ক্রমকে ফুটিয়ে তুলি আমার দেশের পতাকার আদলে।। :)

Sunday, August 17, 2014

কি দরকার মানুষের মন নিয়ে এইভাবে খেলার?




মাঝে মাঝে চিন্তা করি একজন মানুষ আরেকটা মানুষের লাইফ নিয়ে কিভাবে খেলতে পারে???

যাই হোক, কাহিনীতে আসা যাক।

আমার একটা ফ্রেন্ড আছে নাম রাফি, সেই একেবারে কলেজ লাইফের প্রথম থেকেই সে একটা মেয়েকে ভালোবাসে। মেয়ের নাম সানজিদা।

রিলেশনটা এক পক্ষীয় কখনোই ছিল না, রাফি তো মেয়েটাকে ভালোবাসতোই আর মেয়েটাও ভালোবাসত (এমনিতে অভিনয় করত)।

এই মেয়ের যখন যেটা চাইতো, রাফি তা করে দিত, হোক সেটা যেভাবেই, প্রত্যেকদিন মেয়েটার মোবাইলে ৫০-১০০ টাকা ফ্লেক্সি করতে কখনোই ভুলত না সে।
 না সে নিজ থেকেই ফ্লেক্সি করে দিত তাও কিন্তু না, মেয়েটা চাইত বলেই দিত।
ফোন করে বলত
- জান, আমার না মোবাইলে টাকা নেই।

এইটুকুই বলত সে, আর কিছু বলা লাগত না, রাফি যেইখান থেকে পারত টাকা ম্যানেজ করে ফ্লেক্সি করে দিত সেই মেয়েকে, এইটা তো শুধু সামান্য একটা উদাহরন, কোথাও খেতে গেলে সেই মেয়ে কিভাবে টাকা খরচ করত তা কাউকে বুঝানো যাবে না।

এরকম অনেকবার হয়েছে, বিল দিতে পারছে না বলে বন্ধুর কল, আর আমরা যে পারতাম সেই যায়গায় গিয়ে বন্ধুকে উদ্ধার করতাম বিলে সাহায্য করে, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রাফি, কতই আর পারত, তাই আমরা যে যতটুক পারতাম সাহায্য করতাম, আমাদের সাহায্যর পরও তার কত টাকা যে দেনা হয়েছে তা বলতে পারব না।

তারপরো মেয়েটার মধ্যে এই ব্যাপারে কখনো কোন কিছুই লক্ষ্য করতাম না, টাকা থাকলেইও অর্ডার দিত, না থাকলেইও দিত, পুরোই ড্যাম কেয়ার যেন এই ব্যাপারে সে ফিলিং লেস।

অনেকবার বন্ধুকে বলতে চেয়েছিলাম যে মেয়েটা আসলে ভালো না, কিন্তু কি দরকার এরকম বলার, ভয় পেতাম এরকম বললে বন্ধুর সাথে না আবার ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, যতই হোক সেই মেয়েটা ছিল তার গার্লফ্রেন্ড, আর বন্ধুর চেয়ে গার্লফ্রেন্ড নিশ্চই একটু বেশি কাছের হবে, তাই আর কখনো সাবধান করিনি, কিন্তু আকার ইঙ্গিতে যে একদম নিষেধ করিনি তাও না।

যাই হোক, ২ জনই এইচএসসি এক্সাম দিয়েছে।

রাফির রেসাল্ট টেনে টুনে এ, আর সানজিদার এ+, না সেই মেয়ে নিজের যোগ্যতাই এ+ পেয়েছে তাও কিন্তু না, ২ বছর যে মেয়ে সারাদিন ফাউ কাজ করে বেরিয়েছে, সেই মেয়েকে পরিক্ষার জন্য রসদ কিন্তু রাফিই জুগিয়েছিল। রাফি পড়ত সায়েন্সে আর সেই কমার্সে পড়ুয়া মেয়ের জন্য সে এর থেকে ওর থেকে নোটস, শিট, ফটোকপি, যত ভালো ভালো সারদের ইম্পর্ট্যান্ট, বই, টেস্টপেপার সবই যোগাড় করে দিয়েছিল এই রাফিই, শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষটা যাতে ভালো করতে পারে তার কারনে, কারন তার ভয় ছিল সানজিদা না আবার ফেল করে বসে??
আর এখন????

১৩ তারিখ এইচএসসি রেসাল্ট দেয়ার পর থেকেই সানজিদার আগের সিম অফ, ফেইসবুকে রাফি এবং আমরা যারা রাফির ফ্রেন্ড সবাই ব্লকড, গতকাল একজন থেকে শুনেছি, মেয়েটা নাকি নতুন সিম নিয়েছে, রাফি এবং আমাদের কাউকে নম্বর দিতেও নিষেধ করে দিয়েছে।
এই সেই মেয়ের ভালোবাসা???? কেন এরকমটা সে করেছে তা আমি রাফি, আমরা কেউই জানিনা, জানবও না হয়ত কখনো।

যে রাফি রিলেশনটার ব্যাপারে এতো সিরিয়াস ছিল যে, তার মাকেও সে ম্যানেজ করে রেখেছিল।
এখন রাফি কই, আর সেই মেয়ে কই???
মাঝে মাঝে চিন্তা করি রাফির অবস্তাটা, রেসাল্ট খারাপ হয়েছে, ফ্যামিলির ফিন্যানশিয়াল কন্ডিশনও তেমন আহামরি না, ফ্যামিলির বড় ছেলে, তার মাঝে ভালোবাসার মানুষটার থেকে প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রনা।

এইরকম ডিপ্রেসড অবস্তাতেই মানুষ আসলে আত্মহত্যা করার সিদ্বান্ত নেয়।

কি দরকার ছিল আসলে মেয়েটার এমন করার।???? কি দরকারটাই ছিল???

আমাদের সমাজে রাফির অবস্তায় এরকম হাজার হাজার ছেলে মেয়ে আছে, এরা কিভাবে আসলে সেই অবস্তা থেকে বের হয়ে আসে আমার জানা নেই, নাহলে ফ্রেন্ডকে আর যাই হোক কিছু সাজেশন দিতাম।

কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় এইসব ভালো মানুষদের লাইফ নিয়ে যারা এরকম একটা খেলা খেলে তাদের আর যাই হোক বেঁচে থাকার অধিকার নেই। সত্যি নেই।

Thursday, August 14, 2014

একাত্তরের অক্ষয় ইতিহাস : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম রঞ্জুর স্মৃতিতে একাত্তর:(২)

প্রথম পর্বঃ একাত্তরের অক্ষয় ইতিহাস: বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম রঞ্জুর স্মৃতিতে একাত্তর: (১)

  

… ডুমুরিয়া অঞ্চলের একটি অপারেশনে আমরা পাকিস্তানি আর রাজাকারদের পুরো ১১ দিন ১১ রাত ঘেরাও করে রাখি। ২ঘন্টা করে পালাক্রমে আমরা পাহারা দিতাম। আমাদের তো রসদের চিন্তা নেই – স্থানীয় মানুষজনই আমাদের খাবার দিয়ে যায়। সেই সাথে হ্যাভারস্যাকে রুটিও আছে। কিন্তু পাকিস্তানিরা যখন দেখে যে আর ২/১ দিনের বেশি রসদ তাদের নেই – তখন তিনশ মিলিশিয়া নিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করে। এই অপারেশনগুলোতে প্রথমে একটানা দুই ঘন্টা ফায়ার চলত। তারপর ওরা ফায়ার করলে আমরাও ফায়ার করি, আমরা ফায়ার করলে ওরা ফায়ার করে এরকম হত। গ্রেনেডের স্প্লিন্ট এর দাগ এখনো আছে। একবার অপারেশনে এক বড়ভাই জানালা দিয়ে ফায়ার করছেন।  তার পিঠে গুলি লেগে সেখানে আটকে আছে – তিনি ফায়ার করছেন। আমাকে বললেন কাচি দিয়ে কেটে গুলি বের করতে। আমি বললাম, এই জং ধরা কাঁচি দিয়ে গুলি বের করলে আবার টিটেনাস হয় যদি। অবশেষে একজন হাত ধুয়ে টেনে সেই গুলি বের করল। 

বড় বড় অপারেশনে আগের রাতে আমাদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হত। অনেক প্লাটুন থাকত সেখানে।  এয়ার ফোর্সের কমান্ডিং অফিসাররাও থাকতেন। চার দিনের খাবার দেওয়া হত। চার দিনের খাবার মানে ষোলটা রুটি। যার যার মত পজিশন নিয়ে আমরা সিগনালের অপেক্ষা করতাম। আলোর সংকেতের সাথে সাথে ২/৩ ঘন্টা একটানা ফায়ার চলত। তারপর একবার আমরা ফায়ার করলে ওরা ফায়ার করত- ওরা ফায়ার করলে আমরা ফায়ার করতাম এভাবে চলত। আমাদের তো রশদের অভাব হত না,  কিন্তু পাকিস্তানিদের জন্য সব রাস্তা ছিল বন্ধ। পশ্চিম দিকে ছিল নদী খাল বিল। সেদিকে ওদের কোনো সাহায্যের আশা ছিল না। পূর্ব, উত্তর কিংবা দক্ষিণ দিকে ওদের যেতে হত। আর আমরা যদি লড়াই করতে করতে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও পরতাম – সাধারণ মানুষ আমাদের সাহায্য করত। কিন্তু পাকিস্তানিরা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরলে সাধারণ মানুষের গণপিটুনি খেয়েই মরত। 

খুলনা আর পূর্ব দিক থেকে যশোর – দুটি রাস্তা। এর মধ্যে আরো কিছু Strategy কাজে লাগানো হত। একটি মাইন, তারপর সেকেন্ডারি মাইন পোঁতা হত পাকিস্তানি কনভয়ের জন্য। একে টাইমিং বলা হত। যেবার ১১/১২ দিন ধরে আমরা ওদের ঘিরে রেখেছিলাম তখন দুই পক্ষের মধ্যেই একটা মানসিক চাপ কাজ করছিল। আমাদের ক্ষেত্রে – এরা কতদিন survive করবে আর ওদের ক্ষেত্রে- এরা কতদিন থাকবে।  পাকিস্তানিরা সারেন্ডার করার পর যাদের মাইনাস করা দরকার তাদের মাইনাস করে ফেলা হত।  বাকিদের আমাদের ক্যাম্পে এনে বুঝিয়ে আমাদের পক্ষে আনার চেষ্টা করা হত।  কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছেড়ে দেয়ার পর এরা আবার রাজাকারিতে ফিরে যেত।  এদের রক্তের মধ্যেই যেন রাজাকারি মিশে গেছে। দ্বিতীয় বার এরকম কাউকে ধরতে পারলে আর কোনো সুযোগ দেওয়া নয়- সরাসরি মাইনাস করে ফেলা হত। 

এর মধ্যে অনেক বড় একটা অঘটন ঘটল শ্যামনগর অপারেশনের সময়। তখন আমার বয়স কম। তবে একশন ভাল পারি। তাই সিনিয়রদের নিয়ে ছিল আমার সেকশন।  আমার ইউনিটের গ্রুপ ছিল সেটি। সাধারণত একটা মেশিনগানকে সামলাতে তিনটা LMG এর প্রয়োজন হয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময় আমার পাশে থাকা পঞ্চাদা আমার কাছে একটা রুটি চাইলেন। আর একটু পরেই ভোর হবে – কিন্তু পঞ্চাদা বলতে লাগলেন – ‘ রঞ্জু, আমি মইরা যাব। এখনই তোর হ্যাভারস্যাক থেকে রুটি দে’।  আমি ফায়ারিং বন্ধ করে পঞ্চাদাকে রুটি দিলাম। ফায়ারিং বন্ধ হয়ার কারণে লাইন অফ ভেঙে গেল। গুলি লেগে পঞ্চাদা মারা গেলেন। একদম পাশ থেকে এভাবে কারো পরে যাওয়ার স্মৃতি এই প্রথম। সেদিন সুন্দরবনে একটু দূরে আমরা ক্যাম্প করলাম। তিন দিক থেকে পাকিস্তানি মিলিটারি ঘিরে ফেলল। ৪০/৫০ জনের একটা প্লাটুনের ১৭ জন সেখানেই শহীদ হলেন। নদী পার হয়ে বাকিরা বেস ক্যাম্পে চলে আসলাম।  

নতুন লোকাল ছেলেদের তখন বেসিক ট্রেনিং দিয়ে আমাদের সাথে নিয়ে নেয়া হত। ওদের গ্রেনেড, মাইন, ক্রলিং, কিভাবে সেল্টার দিতে হয় এসব শেখানো হত।  এই ধারাবাহিকতায় আরেকটা দিনের কথা বলি। আমরা তখন খুলনা শহর থেকে ৫/৭ মাইল দূরে। খুলনা থেকে পাকিস্তানিদের একটা ট্রুপ যশোরের দিকে যাচ্ছে। আমরা স্থানীয় লোকদের দিয়ে তখন রাস্তার দুই পাশে মাটি খূঁড়িয়ে রাখতাম। পাকিস্তানিদের ট্রাক টা তাই মেইন রোডে উঠতে পারছিল না। পিছাতে গিয়ে একদিকে আমাদের গ্রুপ – একদিকে মংলার দিক থেকে আসা শিরোমণি গ্রুপের মাঝে পরে ওরা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।স্বাধীনতার পর আজো খুলনায় সেই বাড়িগুলোতে গুলির চিহ্ন আছে। ছয়টা ট্রাকে সেদিন ৯০/১০০ জন পাকসেনা ছিল। হয়ত এটি পাকিস্তানিদের কোনো সাপ্লাই ইউনিট ছিল। আমরা হলাম পোড় খাওয়া যোদ্ধা – আমাদের সাথে এরা পারবে কেন। 

এরপর ১৬ ডিসেম্বর তো দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। ১৭ ডিসেম্বর আমরা চলে আসলাম খুলনা শহরে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম। বঙ্গবন্ধু চলে আসলেন।এপ্রিল মাসের দিকে আমরা অস্ত্র জমা দিলাম। মাঝখানে পড়াশুনায় যে ভাল ছিলাম,  সেটা নষ্ট হয়ে গেল। এস এস সিতে ৩০০ তে কাটায় কাটায় ১৮০ পেয়ে প্রথম বিভাগ পেলাম। লেটার পেলাম শুধু একটা সাব্জেক্ট এ – ম্যাথ। জীবন চলতে লাগল তার নিজের গতিতে..। 
যতদিন ইন্ডিয়ার বেস ক্যাম্পে থেকে আমরা যুদ্ধ করতে যেতাম ততদিন কেউ মারা গেলে আমরা বারাসাত অার্মি ক্যাম্প এই নিয়ে আসতাম। সেখানে একজন কম্পাউন্ডার ছিলেন – যে কোন অসুখে একটা মিক্সচার খাইয়ে দিতেন – আসলেও অসুখ ভাল হয়ে যেত। আর যখন বাংলাদেশে থেকে যুদ্ধ করতাম তখন কেউ মারা গেলে কিছু সময় যেত আবেগে – তারপর মাটিচাপা দেয়া হত কিংবা নদীতে মারা গেলে নদীতেই সমাহিত করা হত। কেউ হয়ত নামকাওয়াস্তে দোয়া দরুদ পড়ত । মৃত্যুটা তখন ছিল স্বাভাবিক ও আকস্মিক।

ইন্ডিয়ান অংশ থেকে সাইড করে আমাদের একবার ক্যাম্প করা হয়েছিল। সেই ক্যাম্পে পাকিস্তানিরা আক্রমন করল। প্রথমে সেন্ট্রিদের উপর আক্রমন করা হল। তারপর সবাই দেয়াল পার হয়ে অপর পাশে চলে যেতে থাকলাম। দেয়াল বেয়ে উঠতে কিংবা রিফ্লেক্স একশনের জন্য কারো কারো কিছু সময় লাগে। দুলালদা ছিলেন সেরকম। তার গুলি লাগল। তারপর তাকে কিছুদূর ঘাড়ে, কিছুদূর গরুর গাড়ি, কিছুদূর নৌকায় নিয়ে আমরা পৌছালাম বারাসাত। সেখানে তখন ছিলেন কর্ণেল ওসমানী। বারাসাত হাসপাতাল এ রোগীর attendent দের জন্য কোন খাওয়ার ব্যবস্থা তখন ছিল না। কর্নেল ওসমানী আমাকে ১০ টাকা দিলেন খাওয়ার জন্য। সেই একবারই তার সাথে আমার দেখা। 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে যে বাঙালি অফিসাররা বিদ্রোহ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন যেমন ঈস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট – তারা কিন্তু সবসি জানতেন যে আবার যদি কখনো পাকিস্তান অার্মির হাতে পরতে হয় তো সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যাবে। তা জেনেও তারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীতে হয় তুমি বিদ্রোহ করবে নয় থাকবে। শুনেছি, জিয়াউর রহমান নাকি অনেক পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ কথাটা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ ২৭ মার্চ এই তো তার কন্ঠ আমরা শুনেছিলাম। আর এজন্যেই অনেক মুক্তিযোদ্ধা বি এন পি তে যোগ দেন। কারন মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বঙ্গবন্ধুকে কাছে পান নি – পেয়েছেন তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলীদেরকে আর এই মেজর দেরকে। মেজর জলিল, মেজর জিয়াদেরকে। একাত্তরের এই জিয়া আর পঁচাত্তর পরবর্তী জিয়ার মধ্যে তাই আমরা কোন মিল খুঁজে পাইনা। মেজর খালেদ মোশাররফ নেই। কর্নেল তাহের – জাসদ বিদ্রোহ করে ক্ষমতায় আনলেন জিয়াকে। জিয়া প্রথমে শেষ করলেন তাহেরকে, তারপর জাসদকে। এই আচরণের সত্যি কোন ব্যাখ্যা নেই। যেমনিভাবে ব্যাখ্যা নেই আওয়ামী লীগের বাকশালীকরণের। 

একটা স্বাধীন দেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ছিল। আমাদের ও ছিল। সেসব স্বপ্ন যে সত্যি হবার নয় তা বোঝার মত চিন্তাশক্তি বয়স কিছুই আমাদের তখন হয়নি। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের চাহিদা যতটা পূরণ করার চেষ্টা করতেন তাও পারতেন না। যার হাত দিয়ে সাহায্যটুকু পাঠাতেন সেই তা আত্মসাৎ করে নিত। বঙ্গবন্ধুর মত ব্যাক্তিত্বের একজন মানুষ পারতেন জাতীয় অভিভাবক হয়ে থাকতে। পৃথিবীর কোনো দেশ স্বাধীন হবার পর এত তাড়াতাড়ি মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দেয়না। যারা দেশ স্বাধীন করে, তারাই দেশটা চালায়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে তা হয়নি। তাজউদ্দীন আহমেদ সম্পর্কে ভুল ধারনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু  থেকে আলাদা করা হয়েছে তাকে। সেই তাজউদ্দীন আহমেদ- যাকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুর সাথে মিটিং করতে ভয় পেত ভুট্টো। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত এসেছিল ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ।  আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলে কিছু ছিলনা। রাজাকাররা ফিল্ডে ছিল না তখন – ছিল ফারুক রশীদের মত স্বাধীনতার বিশ দিন  আগে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া  লোকেরা।  আর তাদের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছিল তারা কখনোই মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। এমনটা  না হলে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়ত আজ ভিন্ন রকম হতে পারত। 

সাত জন বীরশ্রেষ্ঠ।  আমার পঞ্চাদা নাই। ছয় লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে মাত্র ২০০ জনকে খেতাব দেয়া হয়েছে। এমনও মুক্তিযোদ্ধা আছেন যারা পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙ্কারে গিয়ে পাকিস্তানি মেরে জীবিত ফিরে এসেছেন। তাদের কথা নাই। বীরশ্রেষ্ঠ,  বীর উত্তম, বীর প্রতীক মিলিয়ে মোট মুক্তিযোদ্ধার এক শতাংশ ও নয়। তার মধ্যে civilian দের সং্খ্যা খুবই কম। ছাত্র – কৃষক – শ্রমিক – কখনো মাঠে খেলতে না নামা ভদ্র ছেলেটার হাতে অস্ত্র,  ফর্সা রং ধীরে ধীরে তামাটে হয়ে যাওয়া- হাত পায়ে rash, মাটির ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়…। 

ছয় লাখ নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা। সনদপত্র প্রদানকারীর সং্খ্যা আর ভারতে ট্রেনিং নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সং্খ্যার লিস্ট আছে। সেই লিস্ট নিয়ে গেজেট প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার।  সেই গেজেটের ৪০ নাম্বারে আমার নাম। ২০০৭ সাল থেকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা দেয়া হয়। ৫০০ /= থেকে বেড়ে এখন তা ৩০০০/= হয়েছে।  এই টাকাটার পরিমাণে আমার কিছু যায় আসে না – কিন্তু শতকরা এক বা দুই ভাগ মুক্তিযোদ্ধা আমার মত ভাগ্যবান।  আমার কমান্ডার দুধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা মানিক ভাইয়ের স্ত্রী সন্তান তাকে ছেড়ে গেছে দারিদ্র্যের জন্য। প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিয়ে রেস্টুরেন্টে একসাথে রুপচাঁদা মাছ খেয়েছিলাম আমরা। বিল এসেছিল ৮০০/=।  মানিক ভাই বলেছিলেন – তুমি জানো ৮০০ টাকায় আমার কয়দিন চলে?

বর্তমান সময়ে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার খুব বেশিদূর আর আগাবে না। যতটুকু হয়েছে – গণজাগরণ মঞ্চের উত্তাল সময়ে। তখন এত বড় একটা গণ আন্দোলন – তারুণ্যের দাবি – সাধারণ মানুষের অকুন্ঠ সমর্থন এই আন্দোলনের প্রতি সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সফল করেছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নিজেরই এখন শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা।  সে এখন চাইবে না কোনো পক্ষকে রাগাতে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন ত্যাগী নেতাদের সে দূরে সরিয়ে দেয়। চাটুকারেরা তখন সব লুটে খায়। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে যায় তখন এই চাটুকারেরা দল ছেড়ে সরে যায়, রং বদলায়। ত্যাগী কর্মীরা তখন দলটাকে বাঁচিয়ে রাখে। আওয়ামী লীগ জিতলে শুধু আওয়ামী লীগ ই জেতে,  কিন্তু হারলে সারা দেশকে সাথে নিয়ে হারে- সময়ের সবচেয়ে সত্যি কথা এই বাক্যটি। 

বঙ্গবন্ধু একবার প্রশ্ন করেছিলেন – “৮ কোটি মানুষের ৮ কোটি কম্বল – আমার কম্বলটা কোথায়? ” বুঝতে পেরেছিলেন তিনি এই দুর্নীতির স্বরুপটা। অনেক আক্ষেপ নিয়েই তাই বলেছিলেন  - ‘সব মানুষ পায় হীরার খনি, আমি পাইসি চোরের খনি….।’

 (সমাপ্ত)

মুক্তিযোদ্ধাঃ সাইফ রাজু
সাক্ষাতকারঃ পারভেজ এম রবিন, এবং ফাহিম
লেখাঃ জান্নাতুল ফেরদৌস পুণ্যা
সংগ্রহঃ আবরার হামিম সাজিদ

একাত্তরের অক্ষয় ইতিহাস: বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম রঞ্জুর স্মৃতিতে একাত্তর: (১)



মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি  বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ বছর ধরে মেমোরীতে অনেকটা আছে, অনেকটা  নষ্ট হয়ে গেছে। Evidence তো বলতে গেলে নেই ই। গেরিলা যুদ্ধের ছবি অনেকদিন ছিল আমাদের কাছে। এরপর এমন এক সময় আসল যখন মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দেয়াটাই বিপদ হয়ে দাঁড়াল। সমস্যাগুলো পঁচাত্তরের আগেও ছিল, পরেও। পঁচাত্তরের আগে সমস্যাটা ছিল জাসদ। ওরা যা যা করত,  দায়ভার পরত সরকারের ওপর। নয় মাস ধরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল অনেক বেশি। তবে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের শুরু একাত্তরে নয়, বরং অনেক আগে…।

যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমরা থাকি খুলনায়। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। সরকারী চাকরীর সুবাদে কোথাওই স্থায়ী হওয়া যেত না। বাবার সাথে সাথে আমরাও ছিলাম ভবঘুরে। যখন যেখানে ট্রান্সফার হতেন আমাদের সেখানেই সেখানকার স্কুলে পড়তে হত। একাত্তরে আমি ছিলাম ক্লাস টেনের ছাত্র। কিছুদিন পরেই আমার মেট্রিক পরীক্ষা।

ব্যাপারটা যখন খুব ক্রাইসিসের দিকে গেল বাবাকে চিন্তা করতে হত, তিনি পরের মাসের বেতন পাবেন কিনা। বর্তমান সময় আর তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ  ভিন্ন। সে সময়ে একজন সরকারী কর্মকর্তাকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হত তার বেতনের উপরেই। তাই, বেতন পাওয়া না গেলে হয়তো আমাদের সবাইকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হত।

সেই সময় আমরা যারা খেলার সাথী ছিলাম, খেলার মাঠেই আমাদের মাঝে বিভিন্ন আলোচনা হত। যারা বয়সে একটু বড় ছিলেন, তারা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন — ভুট্টো কী বললেন, বঙ্গবন্ধু কী বললেন, এসব। অবশ্য তখন তো বঙ্গবন্ধু বলা হত না তাকে। তাকে বলা হত “শেখ সাহেব।” আমরা তাকে সেই নামেই ডাকতাম। শেখ সাহেবকে আমি চিনলাম আগরতলা মামলার সময়ে। তখন তার কোন মিটিং-ভাষণ না শুনেই, শুধু জানলাম পাকিস্তানীরা মিথ্যা মামলায় একজন বাঙালীকে আটকেছে। তো পাকিস্তানীরা বাঙালীকে কেন আটকাবে? খুব সোজা হিসাব। এত ঘোরপ্যাচ ছিল না তখন। তখন বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করতে আওয়ামী লীগ করা লাগত না। তখন কেউই আওয়ামী লীগ করত না, আবার সবাইই আওয়ামী লীগ করত।

সে সময় অ্যাকটিভ দলগুলোর মধ্যে ছিল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম আর জামাতে ইসলাম। আওয়ামী লীগের মধ্যে ছাত্রলীগটা বেশ শক্তিশালী ছিল। সত্তরের নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিই পেল আওয়ামী লীগ। বাকি দু’টোর মধ্যে একটা পেয়েছিল চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় আর আরেকটা নুরুল আমিন। পশ্চিম পাকিস্তানের একটা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল পিপলস পার্টির তুলনায়। তো স্বভাবতই আমরা ধরে নিলাম এবার আমাদের হাতে ক্ষমতা আসছে। তখন ইয়াহিয়ারও সে ধরণের মনোভাবই ছিল। তিনি বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চিন্তাভাবনাই করছিলেন। কিন্তু, লারকানায় পাখি শিকারের নামে ভুট্টো আর ইহাহিয়ার গোপন বৈঠকে ভুট্টো তাকে বোঝালেন, বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা দেয়া যাবে না। দিলেই তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে শোষণ করতে শুরু করবে আর ইন্ডিয়ার সাথে মিলে যাবে। এর পরেই ইয়াহিয়া বেকে বসতে শুরু করেন। পরিস্থিতি ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে।

আমাদের মানসিকতাও ক্রমশ এন্টিপাকিস্তানী হয়ে উঠতে শুরু করে। আমাদের উপর পাকিস্তানিদের প্রথম আক্রমণটা ছিল ভাষাকেন্দ্রিক। বাঙালি জাতির ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাতে আছে হাজার বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি। তো ছাত্রদের মধ্যে হঠাৎ এতটা কনশাশনেস কোত্থেকে এলো তার প্রেক্ষাপটটা বলে নিলে ভাল হয়। তখনকার সময়ে ছাত্রদের আসল মনোযোগ ছিল, কখন ক্লাস শেষ করে ফুটবল মাঠে যাবে। এর চেয়ে বেশি চিন্তাভাবনা তাদের ছিল না। আর সপ্তাহ শেষে সিনেমা হলে যেত। আইডি কার্ড দেখালে হাফ পাস ছিল। তো সবার মূল টার্গেট ছিল সপ্তাহে কিভাবে পঞ্চাশ পয়সা যোগাড় করা যায়। এর বাইরে কারও কোন চিন্তাভাবনা ছিল না। তো এর মধ্যে আমাদের নতুন একটা বই এলো — দেশ ও কৃষ্টি। আমি বইটা পুরোপুরি পড়ি নাই। তবে যেটুকু পড়েছি, তাতেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। সেখানে পাকিস্তানের সবগুলো প্রদেশ নিয়ে লেখা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে লেস ইম্পর্টেন্ট রাখা হয়েছে বাংলাকে। এদের কোন ইতিহাস নাই, এদের কালচার নাই, এরা শুধু মাছ খায়, এদের আর কোন কাজ নাই। ছাত্ররা ক্ষেপে উঠল — দেশ ও কৃষ্টি, দেশ ও কৃষ্টি / বাতিল কর, বাতিল কর । সেটা ঊনসত্তরের ঘটনা। তো এই আন্দোলনের মাঝে পুলিশ গুলি চালালো। সেখানে হাদীস নামে এক ছেলে মারা যায় আমার সামনেই। খুলনায় একটা পার্ক আছে তার নামে — হাদিস পার্ক । তো তখন থেকেই আমাদের মাঝে রাজনৈতিক কনশাশনেস জন্ম নেয়। মনের মধ্যে একটা আগুন জন্ম নেয়। বিদ্রোহের মত — পাকিস্তানীরা আমাদের শত্রু

তার সাথে যোগ হল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ — বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ । খুলনায় বসেই আমরা শুনছি, রেসকোর্সে লোক ধরার জায়গা হচ্ছে না। পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদ, গাছের ডালে মানুষ বসে আছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনবে বলে। এর মধ্যে হঠাৎ রেডিও বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার রেডিও চালু হল। শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধ বলছে — এই মাত্র খবর পেলাম, রেডিও না’কি বন্ধ হয়ে গেছে। আমার মানুষদের আমার কথা শুনতে দেয়া হচ্ছে না।  তো সেই ভাষণ আর ঠিকমত শুনতে পারিনি। কিন্তু, রেসকোর্সে এত মানুষ এসেছে শুনে খুব উৎসাহিত বোধ করলাম।

তারপর আর খুব বেশি খবর পাইনি। এর পর তো এলো অপরাশেন সার্চ লাইট। ২৫শে মার্চে আমরা খবর পাইনি। আমরা খবর পেলাম যখন মানুষ গ্রামের দিকে পালিয়ে আসা শুরু করল। আর তাদের পেছন পেছন আসতে শুরু করল পাকিস্তানী বাহিনী। তার মাঝে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শুনতে পেলাম — I, Major Ziaur Rahman, on behalf of our great leader and the supreme commander of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman, do hereby proclaim the independence of Bangladesh. 
আমরা চার বন্ধু মিলে প্লান করলাম যুদ্ধে যাবার। তখন পরিস্থিতিটা এমন যে, মিলিটারিরা মংলা দিয়ে আসছে। ঘরে ঘরে ঢুকে তরুণ ছেলে যাকে পাচ্ছে তাকেই মেরে ফেলছে। কারণ, তারা ভাল করেই জানতো তাদের মূল শত্রু হচ্ছে এসব তরুণ-যুবারাই। এদেরকে মেরে ফেললে অটোমেটিক্যালি দেশ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। প্রাথমিক ভাবে তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল।

এপ্রিল মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা ঘর ছাড়লাম। তখন সবাই ভারতে যাওয়া শুরু করেছে। কারও যাতায়াতই নিরাপদ ছিল না। কিন্তু, আমাদের মত বয়েসী ছেলেদের জন্য সেটা আরও বিপজ্জনক ছিল। আমরা প্রথমে খুলনা লঞ্চঘাট থেকে গেলাম কালীগঞ্জে। আমাদের সাথে একটা ছেলে ছিল, নাম — কুমু। কুমুর এক আত্মীয় ছিল কালীগঞ্জে। আমরা তার বাসাতেই উঠলাম। সেখান থেকে তিনি আমাদের বর্ডার পর্যন্ত পৌছে দেয়ার জন্য লোক ঠিক করলেন। সেই লোক আবার সে এলাকার বিখ্যাত ডাকাত। আমরা তার সাথেই বর্ডারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সে আমাদের ইছামতি নদী পর্যন্ত পৌছে দিল। ইছামতির এপারে বাংলাদেশ। ওপারে ইন্ডিয়া। সে আমাদের সাথে খানিকটা ভেতরে গিয়ে ওপারে ডাকাতের যে সহচর, তার বাসায় গেল। প্রচণ্ড ক্লান্ত-শ্রান্ত আর ক্ষুধার্ত। সেখানে আমাদের খেতে দিল জাউ (মাড়সহ নরম ভাত) তার ওপর কুরানো নারকেল ছিটানো আর এক পাশে খানিকটা ঝোলা (তরল) গুড়। সেই খাবারের কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে। সেটাই রীতিমত অমৃতের মত খেলাম। তারপর তারা সেখানে আমাদের পথ দেখিয়ে দিল — এই রাস্তা ধরে পাঁচ মাইল হেঁটে গেলেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প

হেঁটে সেই ক্যাম্পে পৌছুলাম।  সেখানে যে চারজন আমরা গিয়েছিলাম তার মধ্যে একজন ছিল হীরা। আমাদের চেয়ে কয়েক বছরের বড় ছিল। সে চারজনের মধ্যে দুজন মারা গেছে,  দুজন এখনো বেঁচে আছি। একজন সেন্ট্রি আমাদের দাঁড় করিয়ে ভেতরে অফিসারদের ডাকতে গেল। তখনও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সেভাবে শুরু হয়নি। সেখানে ছিলেন লেফটেন্যান্ট আরেফিন।  পাকিস্তান সেনাবাহিনী তে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট থাকা অবস্থায় যিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা  যুদ্ধে যোগ দেন। আমাদের আগে মাত্র একটা ব্যাচ ট্রেনিংয়ে গেছে। আমরাই ছিলাম দ্বিতীয় ব্যাচে। তাই ম্যানপাওয়ার বাড়ানোর জন্য যা যা করনীয় তারা তাই তাই করত। ফলে আমাদের ঢুকে যেতে সমস্যা হয়নি।

এটা ছিল মূলত একটা কোম্পানি ইউনিট।  নিয়মিত  বাহিনীতে তিনটা সেকশন মিলে হয় একটা প্লাটুন, তিন বা ততোধিক প্লাটুন মিলে হয় একটা ইউনিট। সেখানেই আমাদের আনুসাঙ্গিক ট্রেনিং শুরু হল। আমাদের ক্যাম্পটা ছিল একটা রাইস মিলে। রাইস মিলের সামনে ধান শুকানোর জন্য বিশাল চাতাল। তার ওপর টিনের শেড। সেখানেই আমরা সবাই থাকতাম — প্রায় দুইশত এনসিও অর্থাৎ নন কমিশন্ড অফিসার । পাশে তিন চারটা তাবুতে থাকতেন কমিশন্ড অফিসারেরা। তারা ছিলেন – ক্যাপ্টেন নূরুল হুদা, লেফটেন্যান্ট বেগ, লেফটেন্যান্ট আরেফিন আর একজন ACO অফিসার। এর বাইরে ২০০ জন ছিল NCO অর্থাৎ নন কমিশনড অফিসার এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা।  

সেখান থেকে আমাদের ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হল বিহারের একটা পরিত্যাক্ত এয়ার স্ট্রিপে। ১৯৬৫ সালে সেটা প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের কারণে পরিত্যক্ত হয়। সেখানে আমাদের ট্রেনিং দেয়া হয় চার সপ্তাহ। এ ধরণের ট্রেনিং সাধারণ আর্মিদের জন্য নূন্যতম ছয় মাস হবার কথা। কিন্তু, আমাদের কেতাবী পাঠ পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়।শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে মৌলিক যে জ্ঞানটুকু দরকার, তাই দেয়া হয় — How to protect yourself and how to kill the enemy. থ্রিনটথ্রি রাইফেল ব্যবহার, গ্রেনেড ছোড়া, অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ — ইত্যাদি শেখানো হত আমাদের। আমাদের মূলত ট্রেনিং দিত ভারতীয় JCO, NCOরা আর ওভার অল তত্ত্বাবধানে থাকত কমিশন্ড অফিসারেরা।

প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের ফায়ারিংয়ের একটা পরীক্ষা দিতে হত — কার কার ফায়ারিং অ্যাভব অ্যাভারেজ। মোটামুটি সবাই পাশ করত। কারণ, তখন পরিস্থিতিটাই এমন ছিল — সবচেয়ে ভীতু ছেলেটাও গড়পততা সাহসী হয়ে যেত । অস্ত্রের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি হবার পরে মানুষের মধ্যে মানসিক একটা শক্তি এসে হাজির হত। আর বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ থাকত না কারও মধ্যে — আমি যেটা করছি, শতভাগ সঠিক জেনেই করছি

তিন সপ্তাহ পরে ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় যে অস্ত্র — এলএমজি বা  Light Machine Gun,  তার ট্রেনিং। সেটা ছিল চমৎকার একটা অস্ত্র। একবার ট্রিগার চেপে রাখলে ম্যাগজিনে থাকা ২৮টা গুলি একবারে বেরিয়ে যেত। তখন তিনটা এলএমজি দিয়ে একটা পাকসেনাদের হেভি মেশিনগানকে কব্জা করা যেত। অস্ত্রটা আমার খুব ভাল লাগল। তো দেখা গেল ফায়ারিংয়ের পরীক্ষায় প্রায় ৭০০ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে আমি সেকেন্ড হয়ে গিয়েছি।

ট্রেনিং শেষ হবার পরেই আমার দেশের ভেতরে চলে আসার কথা। তার আগে ওখানে থেকেই কয়েকটা অপারেশন করলাম। তা দেখে ওখানকার অফিসার বললেন — এই ছেলেটা এলএমজিতে ভাল। ও এখানেই থাক।  তো আমারও আর দেশের ভেতরে ঢোকা হল না। ইন্ডিয়ার ভেতরই থাকলাম। ওখান থেকে দেশের ভেতরে ঢুকেই অপারেশন করতাম। তখন আমাদের রুটিন বাধা কাজ ছিল, প্রতিদিন বিকাল পাঁচটা খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঠিক সূর্যাস্তের সময়ে তিন চারটা গ্রুপ করে তিন চার দিকে চলে যেতাম। কে কোথায় যাবে কেউ জানতাম না। সবাই যে যার প্লাটুন কমান্ডারের নির্দেশ অনুসারে কাজ করতাম। আমার অ্যাকশন ছিল দু’রকমের — সিভিল অ্যাকশন আর মিলিটারি অ্যাকশন । সিভিল অ্যাকশন বলতে, তখন শান্তি বাহিনী তৈরি শুরু হয়ে গেল। শুরুর দিকে তারা মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকলেও পরে পাকিস্তানীদের দালালী করা শুরু করল। তখনও রাজাকার-আলবদর সৃষ্টি হয়নি। এই শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানরাই কোথায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আছে, সেটা পাকিস্তানীদের দেখিয়ে দিত। তো সিভিল অ্যাকশনে আমরা এদেরকে ধরতাম। খোঁজ খবর করতাম, কারা আসলেই শান্তির জন্য কাজ করছে — তাদের ছেড়ে দিতাম । আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকত, পাকিস্তানীদের সহায়তা করছে — তাদের মেরে ফেলতাম । যখন সিভিল অ্যাকশন হত, তখন দেখা যেত মানুষ ধান-চাল, মুরগি, ছাগল — যে যা পারত, তাই আমাদের দিয়ে যেত।

আর মিলিটারি অ্যাকশনে আমাদের কৌশল ছিল — হিট অ্যান্ড রান । মিলিটারি অ্যাকশন যখন হত, তখন পরিপূর্ণ সমরসজ্জায় সজ্জিত হয়ে, রাত দু’টো-তিনটার সময় গিয়ে পজিশন নিতাম। একেবারে ভোর রাতের সময়, যখন ঘুমটা সবচেয়ে বেশি গাড় হয়, সেই সময় আমরা আক্রমণ করতাম — তিন দিক থেকে ফায়ারিং । তখন প্রতি দশটা অ্যাকশনের মধ্যে একটা সফল হত, অর্থাৎ ওরা আত্মসমর্পণ করত। শুরুর দিকে আমাদের লোকবল ছিল বেশ কম। তাই আমাদের টার্গেট ছিল, নিজেদের ক্ষতি না করে পাক বাহিনীকে কতটা ক্ষতিগ্রস্থ করা যায়। আমাদের অপেক্ষাটা ছিল বর্ষাকালের জন্য। কারণ, আমরা ভালমতই বুঝতে পারছিলাম, তখন পাক বাহিনীর ওপর বেশ ভাল রকমের একটা ধকল যাবে। তার এ ধরণের পরিবেশ বা আবহাওয়া কোনোটাতেই অভ্যস্ত নয়। তখন তাদের মূল শত্রু হয়ে দাঁড়াবে বৃষ্টিই। পানিতে মুভমেন্টে সমস্যা হয়। সেটা আমাদের সুবিধা। আর আমাদের স্থানীয় জনগণের সমর্থন আছে। কোথাও থেকে একটা নৌকা জোগাড় করে সবাই মিলে দাঁড় টানলে ঝড়ের বেগে এগিয়ে যেত। বিশ মাইল, ত্রিশ মাইল দূরে অপারেশনেও সমস্যা হত না। পাক বাহিনীকে অতর্কিতে আক্রমণ করে আবার সেই নৌকায় করেই ফিরে আসতাম।

তো এর মধ্যে একদিন আমি আমার অফিসারকে বললাম — কবে মরে টরে যাই, তার কোন ঠিক নেই। আমার কোলকাতা শহরটা দেখার খুব শখ।  তিনি বললেন —  কদিন পরেই তো পরের মাসের বেতন দেবে। সেটা নিয়েই যেন যাই।  তখন আমাদের মাসে পঞ্চাশ টাকা করে বেতন দিত। সেটাই খরচ হত না। সেই সময় খাওয়া তো ক্যাম্প থেকেই দিত। আর হাতখরচ ছিল না বললেই চলে। আমার কাজ ছিল সেই টাকা দিয়ে নিত্য নতুন হাফপ্যান্ট বানানো। পরের মাসে বেতন পাবার পরে কোলকাতা শহরের যাবার প্রস্তুতি নিলাম। স্যার আমাকে আরও দশ টাকা দিলেন। তখন তাতে কোলকাতা যাওয়া আসার ভাড়া হয়ে যায়। আর আমাদের কোথাও ভাড়া লাগত না। আমাদের পোশাক দেখেই বুঝত আমরা জয় বাংলার লোক । শুধু টেম্পুতে ভাড়া দেয়া লাগত। এর আগে আমার সিনিয়র বন্ধুদের কাছে কোলকাতার সিনেমার অনেক প্রশংসা শুনেছিলাম। কয়েকটা সিনেমা দেখলাম। পঞ্চাশ টাকা পকেটে। বিশাল ব্যাপার। আমার সাথে আরেক ভাই ছিল — দুলাল ভাই । তিনি কিনলেই বই — সমরেশ, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, সবার। ম্যাগাজিনও কিনলেন অনেক — আনন্দবাজার পত্রিকার বিভিন্ন ভার্শন। এই লোকটা ছিল বই পাগল। আমরা বাকিরা শুধু সিনেমা দেখি, খাই-দাই আর কোলকাতার চেহারা দেখি। বেশ পুরোনো আমলের অনেক বিল্ডিং ছিল সেখানে। তখন ছিল পূজোর মৌসুম। দুর্গার বিশাল বড় বড় মূর্তি ছিল মণ্ডপগুলোতে। আর মহল্লায় মহল্লায় তখন গান বাজত।

বিহার থেকে ট্রেনিং শেষ করে ক্যাম্পে ফিরে এসেই দেখি, আরেকটা প্লাটুন এসেছে ট্রেনিং নিতে। ওইখানে কোম্পানি কমান্ডার আমার আরেক বড় ভাই। তো তিনি যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেতে চাইলেন। আমাকে বললেন, তুই কথা বলবি না আমি কথা বলব?আমি বললাম, আচ্ছা আমিই কথা বলে দেখি।
তো সেই বড় ভাইয়ের সাথে আমি চলে এলাম ডুমুরিয়া। সেই এলাকা তখন নকশাল অধ্যুষিত। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে এরা কিছুই না, স্রেফ ডাকাতি-টাকাতি করে। এলাকায় যারা পয়সাওয়ালা আছে, তাদের ব্ল্যাকমেইল করে টাকা পয়সা আদায় করে।

এভাবেই ছোট বড় অপারেশনের মধ্যে দিয়ে বর্ষাকাল শেষ হল। নভেম্বর আসতে আসতে বেশিরভাগ এলাকা আমাদের দখলে চলে এলো। পরিস্থিতিটা তখন এমন — পাক আর্মি যেখানে ক্যাম্প করেছে, সেই এলাকাটাই শুধু তাদের। বাকি সব এলাকা আমাদের। মোটামুটি ঘটনা প্রবাহ আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বর্ষাকালে ওরা যেই আঘাতটা পেয়েছিল, সেটা আর ওরা পুষিয়ে উঠতে পারেনি। আমরাও তখন অনেক বেশি পরিনত। আগে যা করতে হাত কাঁপত, এখন তা নির্দ্বিধায় করে ফেলি। মৃত্যুভয় প্রায় নেই বললেই চলে। একবারে ড্যাম কেয়ার সবকিছুতেই….।

দ্বিতীয় পর্ব এইখানেঃ

একাত্তরের অক্ষয় ইতিহাস : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম রঞ্জুর স্মৃতিতে একাত্তর:(২)

সুইসাইড করার পরের আত্মকথা।




এখন রাত ১১টা

সুইসাইড করছি সেই ৩ ঘন্টা আগেই, কেউ এখন পর্যন্ত খোঁজও নিল না, সেই কতক্ষন থেকে ফ্যানের উপর ঝুলে আছি, আর কতক্ষন ঝুলে থাকব ধেত।
ধুর আমিও তো পাগল দেখি, আমার খোজ করার আশা করছি কেমনে, দরজা তো আমি এই পাশ থেকে আটকিয়ে দিয়েছিলাম।

কিরে বাইরে এতো চ্যাচাম্যাচি শোনা যায় কেন??? একটু খেয়াল করে শুনি তো। মরে যাওয়ার পর থেকেই কানে কম শুনতে পাচ্ছি, কিছু শুনতে হলো অনেক বেশি কন্সেন্ট্রেশন করতে হচ্ছে।
ঐ তো আম্মুর গলা, দরজা খুলতে বলছে, কিন্তু আমি কেমনে খুলি, সেই ৩ ঘন্টা আগ থেকেই যে আমার নিথর দেহ ঝুলে আছে সেই ফ্যানের সাথে, আমি মরে যাওয়ার পরও আসলে সব কিছুই করতে পারছি দেখছি, শুনছি, সবার আশে পাশে ঘুরছি সব, শুধু কেউ আমার ফিলিংস টের পাচ্ছে না এই যা।

আরেহ আরেহ দরজা দেখি ভেঙ্গে ফেলল। আমাকে নামানোর কাজ চলছে, উফফ বাবা বাঁচা গেল, তোমরা তাহলে এতক্ষনে আসলা, নামাও নামাও তারাতারি বহুত কতক্ষন ঝুলে আছি।

সকাল ৭টা

সেই যে ফ্যান থেকে নামানোর পর কান্নাকাটি শুরু হইছে এখনো থামার নাম নাই, আরেহ বাপ কান্নাকাটি করার চেয়ে কেউ কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করো, তেলাওয়াত শুনতে বেশ লাগছিল। এর আগে পুলিশ এসে পোস্টমর্টেম না টোস্টমর্টেম কি জানি করতে চেয়েছিল, ভাগ্য ভালো ফ্যামিলি থেকে করতে দেয়া হয় নাই। কি কাটা ছেড়া করে বডিকে এক অবস্তা বানিয়ে ফেলে ডাক্তাররা যে নিজের বডি দেখেই নিজেরই ঘৃনা লাগে। ভালোই হইছে দেয় নাই করতে।

আম্মুটা বেশি কাদতেছে, উফফু কি করি। আমি আসলে প্রথম সুইসাইড করতে চাই নাই, কিন্তু কি আর করা যে রেসাল্ট করেছি, তাতে তো কাউকে মুখে দেখানোরও উপায় নেই। আর মানুষজনের অবস্তা দেখলে তো মনে হয় তারা বেচে আছেই মানুষের রেসাল্ট জানার জন্য, কারো রেসাল্ট জানতে না পারলে যেন সে মরে যাবে এমন অবস্তা। আর আত্মীয়স্বজনদের কথা তো আর নাই বললাম মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কয় হাজার ফোন পাইছি খোদা মালুম। এই ছোট বাংলাদেশে এতো এতো ট্যালেন্ট স্টুডেন্টের ভিড়ে কই যায়গা হবে আমার??? তাই আর না পারতে সুইসাইড করেছিলাম, আমার মত একটা ছেলে সমাজ থেকে কমে গেলে কারোই কিছু আসে যাবে না, তাই এই সিদ্বান্ত নিয়েছিলাম।

এই তো দেখি হজুর সাহেব, এই বেটা আসার পর থেকেই ঢং করছে, আসছে সে মওতা বাড়িতে, ভাব দেখে মনে হচ্ছে আসছে মেজবানে। ওরে তিনি আমাকে গোসল করানোর ব্যাপারে কথা বলছেন। আরেহ এই ব্যাটা ফাজিল হজুর কি গাধা নাকি, আমি তো সুইসাইড করার আগেই গোসল করে নিছিলাম, কিন্তু এখন আবার গোসল করানোর কথা বলে কেন? কি বিশ্রী ব্যাপার স্যাপার এতোগুলো পুরুষ মানুষ আমাকে উলঙ্গ করে নাকি গোসল করাবে ধ্যাত, আমিও কথা বলতে পারতেছি না আর তারাও সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছা তা করতেছে।

নিজেদের ইচ্ছামত সিস্টেমে তারা আমাকে গোসল করালো, এখন খাটিয়াতে শুয়ে রেখেছে প্রায় ৫ মিনিট হলো। প্রচুর মানুষ আশেপাশে, চেনা জানা সবাই খাটিয়ার আশেপাশে কেন?? পুরো গুমোট বাধা পরিবেশ। এই মানুষগুলো মরা মানুষ দেখতে অন্য টাইপের ফিলিংস পায় মনে হয়। এতো মানুষ কেন।?? ভিড় মোটেইও ভালো লাগছে না।

সকাল ১০টা

বাপরে যতগুলো মানুষ!!!! এতো মানুষ হয় কেমনে জানাজাতে, এতো মানুষ আমি আশা করি নাই, আমাকে তো এতো মানুষ চিনত না, তারপরো এতো মানুষ!!!! খাটিয়াতে শুয়ে থাকা অবস্তায়ও অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু তারা যে এখন জানাজাতেও থাকবে তা ভাবি নাই, যাই হোক ভালোই হলো অনেক মানুষ এসেছে।
সকাল সাড়ে ১০টা।
এইবার আমাকে দাফনের পালা, আরেহ আমাকে কবর দিবে এই জঘন্য স্থানে, ধুর এইটার কোন মানেই হয় না। এইরকম নোংরা যায়গা কেন তারা আমার কবর নির্বাচন করল কিছুই বুঝলাম না, কিরকম স্যাথস্যাথে পরিবেশ।

আমার লাশটা বেশ ভালোভাবেই তারা শুয়িয়ে দিয়েছে কবরের মধ্যে। এইবার উপরে বাশ দিবে, তারপর চাটাই তারপর মাটি। কিরে এরকম উপরে উঠে যাচ্ছি কেন !!! কিরে দাফন কাজই এখন সম্পন্ন হয় নাই এর আগেই এরকম এট্র‍্যাকশন অনুভব করছি যে!!!

আল্লাহ আল্লাহ আমি এখন মাটির থেকে প্রায় ৫০০ ফিট উপরে, আমার শরীরের উপর আমার আর কোন কন্ট্রোল নেই, সোজা উপরের দিকে উঠছি, কেন উঠছি কি কারনে উঠছি কিছুই জানি না, শুধু মনে হচ্ছে আমি একটা কোন এক এট্র‍্যাকশনের মাধ্যমে উপরে উঠে যাচ্ছি। চোখের জ্যোতিও কমে যাচ্ছে, আশেপাশের আওয়াজও আর পাচ্ছি না। ও বুঝচ্ছি মারা যাওয়ার পরের ফিলিংস মনে হয় এটাই। শেষবারে ফ্যামিলির সবার চেহারাটা একবার মনে করতে পারি কিনা দেখি। ঐ যে আম্মুর চেহারাটা একটু একটু, মনে পরছে আর কিছু মনে করতে পারছিনা, ছোট বোনটার চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করছি, না আর হোলো না, পারছি না।

চারদিকে অন্ধকার, ঐ যে সামান্য সামান্য দেখতে পারছি পৃথিবীর কিছু অংশ। আমি এক অতল গহবরের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি।

আর কিছুক্ষন পরেই চোখের সীমানার বাহিরে চলে যাব, এর আগেই বলে নিলাম।

বিদায় হে পৃথিবী, তোমার থেকে বিদায় নিলাম, আর ফিরব না কখনো।

বিদায়। :)

Tuesday, November 26, 2013

ছাগুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছু অব্যর্থ অস্ত্র



পোলাপাইন প্রায়ই আমার কাছে কিছু ছাগুর স্যাম্পল বয়ান নিয়া আসে। তারা এইসবের উত্তর দিতে চায়। অনেকবার কইছি যখন জানো এইটা ছাগু, তখন এইটাও নিশ্চিত জানবা সে মিছা কথা কয় এবং সত্যি ঘটনারে টুইস্ট দিয়া প্রচার করে। কিন্তু তারপরও তারা ছাগুদের পছন্দ করে, তাগো কথা শুইনা বিভ্রান্ত হয়। কি আর করা। যাহোক নিচে কিছু লিংক আছে, এইগুলা বুকমার্ক কইরা রাখো, ছাগু পোন্দানিতে কাজে আসবে।মনে প্রশ্ন জাগত পারে এইখানে তো আওয়ামী লীগের ফরে কথা বলা হইতেছে দেখা যায়, ব্যাপারটা এইরকম, ছাগু পোন্দাইলেই তারা ভাববো হয় তুমি আওয়ামী লীগ, নাইলে নাস্তিক কিংবা দুইটাই। গালিও দিবো সেটা বইলা। নিজেরে ডিফেন্ড করতেই এইগুলা জানতে হবে। এই তরিকা সম্পূর্ণ অমি পিয়ালের নিজস্ব মেধা শ্রম ও উপাত্তের ভিত্তিতে লেখা। এইখানে কারো টাকায় লেখা কোনো পোসট নাই, কারা সহযোগিতাও নাই। অমি পিয়াল সারাজীবন একাই ছাগু পোন্দায়, তার কাউরে আগেও লাগে নাই, এখনও লাগে না। শুরু করি আমার একটা সাম্প্রতিক লেখা দিয়া:

প্রসঙ্গ বাঙালী বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ


আমরা হিন্দু-মুসলমান যেমন সত্য,তার চেয়ে বেশী সত্য যে আমরা বাঙালী। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা-প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালীর এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে এবং টুপি-লুঙ্গিতে দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই। … ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ


তুমি কে আমি কে! বাঙালী বাঙালী… শ্লোগানটা ১৯৭১ সালের। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের উত্তাল কয়েকটি মাসে বাঙালী এভাবেই জানান দিয়েছিলো তার আত্মপরিচয়ের। এই পরিচয়েই সে পরিচিত হতে চাইছিলো। সে তার বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য এর আগে রক্ত দিয়েছে। এরপর রক্তপণ করেছে তার বাঙালীয়ানার জন্য স্বাধীন দেশ, স্বাধীন পতাকা, জাতীয় সঙ্গীতের, বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ভুখন্ডের প্রতিষ্ঠার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার বেসিক এবং মন্ত্রগুপ্তিই এই বাঙালী জাতীয়তাবাদ।

সেটা হঠাৎ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে রূপ নিলো কেনো সেটা নিয়ে অনেকের কৌতুহূল এবং একে জাস্টিফাই করার জন্য তাদের হাতে যুক্তিও প্রচুর। এ ব্যাপারে সহায়ক হতে পারে মুক্তিযুদ্ধকালে নির্দিষ্ট করে বললে ৬ জুন গোলাম আযমের একটা বিবৃতি, যাতে বলা হয়েছে,জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের বদলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ মেনে নিতে রাজী নয়। এবং এর প্রেক্ষিতে তার যুক্তি ছিলো ‘কোনো বিদেশী শাসকের শাসন আজাদির (স্বাধীনতার) পরিপন্থী নয়, ইসলামে এর বিরুদ্ধে কোনো নির্দেশনা নেই।’ অর্থাৎ ভিনদেশের দালালী এবং অধীনতাও কিনা ইসলাম সম্মত।সেই সময়টায় স্বাধীনতাবিরোধীরা এই বাঙালী গণজাগরণের বিরুদ্ধে ধর্মকে দাড় করিয়ে দিয়েছিলো। ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ শেখ মুজিব ও শ্রী তাজউদ্দিনের নিজস্ব সৃষ্টি, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এর সমর্থক নয়’ ইত্যাদি বয়ানসহকারে তাতে বোঝাতে চাইছিলো জয় বাংলা হলো জয় হিন্দের মতো একটা শ্লোগান। বাঙালী হলো পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা, আর তারাই এই দেশটাকে ভেঙে বাংলাদেশ বানাতে চাইছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রেডিওতে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ সম্বোধন করে এই হত্যাকান্ডের পক্ষে সাফাই দিয়েছিলো খুনীরা (মেজর শরিফুল ইসলাম ডালিম)। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। খন্দকার মোশতাক আহমেদ তার ৮৩ দিনের শাসনকালে মুক্তিযুদ্ধের চারটা স্তম্ভের উপর হাত দিতে সাহস পাননি। ১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্সে (যেখানে বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন এবং যেখানে এখন শিশুপার্ক) দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ডাকা এক ইসলামী মাহফিলে শ্লোগান উঠেছিল সব বদলের। চাঁনতারা পতাকা চাই এবং হিন্দু কবির লেখা জাতীয় সঙ্গীত চলবে না। শকুনের দোয়ায় গরুটা না মরলেও ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে নিয়ে এলেন। বাঙালীকে দুইভাগ করে দিলেন ধর্মের ভিত্তিতে। পশ্চিমবঙ্গেও বাঙালী আছে এই কুযুক্তিতে। এবং তালিকায় যুক্ত করলেন আদিবাসী উপজাতিদের।এটা আদি মুসলিম বাংলা ও তার সমর্থকদের পুরানো যুক্তি। প্রশ্ন উঠতেই পারে এর বিপক্ষে কি বলা যায় কিংবা ইনবক্সে এক ছোটভাই যেমন প্রশ্ন তুললো, বঙ্গবন্ধু কোন প্রেক্ষিতে আদিবাসীদের বাঙালী হয়ে যেতে বলেছিলেন?

উত্তর দেয়ার আগে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল তাত্বিক স্বাধীনতাবিরোধী খন্দকার আবদুল হামিদের (১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল টিক্কাখানের সঙ্গে বৈঠকে গোলাম আযমকে নিয়ে গিয়েছিলো যে) বক্তব্যটা জেনে রাখা জরুরী। ‘আমাদের জাতীয়তাকে বাংলাদেশী জাতীয়তা বলাই এপ্রোপ্রিয়েট বা সঙ্গত। … এই জাতির রয়েছে গৌরবময় নাম-নিশানা, ওয়ারিসি-উত্তরাধিকার, ঐতিহ্য-ইতিহাস,ঈমান-আমান,যবান-লিসান, শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্য-সঙ্গীত সবকিছু।… এদের (বাংলাদেশের মানুষের) জীবনে ও মনোজগতে রয়েছে অসংখ্য বৈশিষ্ট্য যা সারা পৃথিবী থেকে এদের স্বাতন্ত্র দান করেছে-এমনকি অন্যান্য দেশের বা অঞ্চলের বাংলাভাষী এবং ইসলাম অনুসারীদের থেকেও। ওই বৈশিষ্টটুকুই বাংলাদেশী জাতীয়তার উপাদান। এগুলো বাকল নয়, আসল সারাংশ।আর এই সারাংশই বাংলাদেশী জাতীয়তার আসল শক্তি, ভিত্তি ও বুনিয়াদ।’

তাহলেই জানতেই হয় বঙ্গবন্ধু তার বাঙালী জাতীয়তাবাদের পক্ষে কি বলেছিলেন, কি যুক্তি ছিলো তার। তার ভাষায়.
‘জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালী জাতি ঝাপিয়ে পড়েছিলো চরম মরণপন সংগ্রামে। জাতীয়তাবাদ না হলে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই মূল নীতির উপর ভিত্তি করে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। আমরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি। জাতীয়তাবাদের অনেক সংজ্ঞা আছে। অনেক ঋষি, অনেক মনিষী, অনেক বুদ্ধিজীবি, অনেক শিক্ষাবিদ এ সম্পর্কে অনেকরকম সংজ্ঞা দিয়েছেন। সুতরাং এ সম্পর্কে আমি নতুন কোনো সংজ্ঞা আর নাই বা দিলাম।আমি শুধু বলতে পারি, আমি যে বাংলাদেশের মানুষ, আমি একটা জাতি। এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন, সকলের সাথে একটা জিনিস রয়েছে সেটি হচ্ছে অনুভূতি। সেই অনুভূতি যদি না থাকে, তাহলে কোনো জাতি বড় হতে পারে না এবং জাতীয়তাবাদ আসতে পারে না।অনেক জাতি আছে যারা বিভিন্ন ভাষাবলম্বী হয়েও এক জাতি হয়েছে (আমার উদাহরণ: ভারত)। অনেক দেশে আছে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সব কিছু, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে, তারা একটি জাতি হতে পারে নাই (আমার উদাহরণ: লিবিয়া, সোমালিয়াসহ আফ্রিকার কিছু দেশ যারা ধর্ম-ভাষায় এক হয়েও ট্রাইবের ভিত্তিতে বিভক্ত)। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর। আজ বাঙালী জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিলো যার উপর ভিত্তি করে, এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিলো যার উপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতিটুকু আছে বলেই আমি বাঙালী, আমার জাতীয়তাবাদ বাঙালী জাতীয়তাবাদ।’


অনুভূতিটা আরও বিষদভাবে টের পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এক স্মৃতিচারণে (১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর গণপরিষদে দেওয়া ভাষণে)- ব্যক্তিগতভাবে এই চেতনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ১৯৫৯ সালে। তখন আমি পাঞ্জাব রেজিমেন্ট থেকে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক হয়ে বদলি হয়ে আসি। শুধু বাঙালীদের নিয়ে গঠিত ইতিহাসের এই সর্বপ্রথম নিয়মিত ইনফ্যানট্রি রেজিমেন্টের তখন শৈশব অবস্থা। আমি প্রথম বাঙালী লে.কর্ণেল এই পল্টনে অধিনায়ক হিসেবে যোগ দিই। সৈন্যরা সেদিন আনন্দে আর গর্বে বলাবলি করেছিলো, ‘আমরা বাঙালী, বাঙালী এসেছে আমাদের অধিনায়ক হয়ে।’ তাদের সেই আনন্দধ্বনি আজও আমার কানে বাজছে।সেইদিন সেই আনন্দোল্লাসের মধ্যে আমি উপলব্ধি করেছিলাম আমার সত্যিকার পরিচয়। আমি জেনেছিলাম আমি কে, কী আমার জাতীয়তা, আমি কাদের মধ্যে জন্মলাভ করেছি, কারা আমার আপনজন ।’

মুক্তিযুদ্ধ ছিলো বাঙালীর সেই আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, সেই আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সম্মান। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে যে দুইখন্ড, তাতে বাঙালী মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো। এই দেশ থেকে হিন্দুদের বিতাড়ন করা হয়েছে নানা সময় নানা অজুহাতে। এখনও হয়। কিন্তু তারপরও তাদের নির্মূল করা যায়নি। এমন নয় তাদের জায়গা নেই বলে। কারণটা আসলে তারা এই ভাষা এই সংস্কৃতি এই শেকড় ছেড়ে যেতে চাইনি বলে। ‘মরলে এই ভিটাই চিতা হবে আমার’ এই দৃঢ়তায় মাটি কামড়ে রয়ে গেছে। ধর্মই যে উদ্ধার নয় বরং পাকিস্তানীদের শোষনের মাধ্যম সেটা বাঙালী মুসলমান টের পেয়েছিলো ধীরে ধীরে। যখন দেখলো তাকে উৎখাত করে বিহারীদের এনে বসানো হচ্ছে তার জায়গায়। তার জমি কেড়ে নিয়ে তার ব্যবসা কেড়ে নিয়ে তাকে দেওয়া হচ্ছে। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ডাম্প করার পর তারা যে বিস্তার নিয়েছিলো ইসরাইল হয়ে, বিহারীদের সেভাবেই প্রতিষ্ঠা করছিলো পাকিস্তানীরা। আদর্শ পাকিস্তানি হবে তাদের মতোই এই উদাহরণ সৃষ্টি করে চাপ দেওয়া হচ্ছিলো বাঙালীদের উপর। এই দেশের মুসলমানরা টের পেলো তার বাঙালী পরিচয়টা বিপন্ন। এবং বৈষম্য, বঞ্চনা ও অত্যাচারের কারণও। তাকে বাঙালী পরিচয় ভুলে পাকিস্তানী হয়ে যেতে হলে সব ত্যাগ করতে হবে, তার আচার কৃষ্টি সংস্কৃতি সব। এবং রক্তের দামে আনা ভাষাটাও। সেই বিপন্ন সময়ে সে গর্জে উঠলো, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, তুমি কে আমি কে, বাঙালী বাঙালী।’


ইংরেজরাও ইংরেজি বলে। আমেরিকানরাও বলে। কিন্তু দুইটা দুই দেশ। বাংলাদেশের বাঙালীরাও বাংলা বলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরারও বাঙালী বলে। কিন্তু তারা ভারতীয় বলে পরিচয় দেয় নিজেদের। একাত্তরে তারা আমাদের সর্বস্ব দিয়ে সহায়তা করেছে আমরা বাঙালী বলে, কিন্তু কস্মিনকালেও তারা পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে আমাদের সঙ্গে এক হতে চায়নি। এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধও সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হয়নি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের যেমন সীমানা নেই, সে ভারতে গেলেও রয়েল বেঙ্গল টাইগারই থাকে, সুন্দরবনের এপারেও তাই। পশ্চিমবঙ্গের জন্য আমাদের যদি বাঙালী থেকে বাংলাদেশী হয়ে যেতে হয়, তাহলে তো এখন বাংলাদেশী ভাষাও বানাতে হয় একটা।

ফিরে আসি উপজাতি প্রশ্নে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তাদের কতখানি সহায়? পার্বত্য চট্টগ্রামে কোথাও সংঘর্ষে কখনও কি পত্রিকায় লেখা হয়েছে শুধু সংঘর্ষ? লেখা হয়েছে বাঙালী-পাহাড়ি সংঘর্ষ, বাঙালী চাকমা সংঘর্ষ, দুইদল বাংলাদেশীর সংঘর্ষ না। যেই বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ডিনাউন্স করে আপনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে আকড়ে ধরলেন, সেই আপনিই কিন্তু তখন তাদের পাহাড়ি কিংবা চাকমা বলে অবজ্ঞা করছেন, পক্ষ নিচ্ছেন বাঙালীর। তাহলে দাড়ালো কি ব্যাপারটা!বরং ১৯৭৯ সালরে পাহাড়ে যে আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের সূচনা জিয়া করেছিলেন তাকে লেজিটিমেসি দিতেই আনা হয়েছিলো ওই বাংলাদেশী জাতীয়বাদ। এক ঢিলে দুই পাখী মারতে। ১৯৭৯ সালের আগেও পাহাড়ে বাঙালী ছিলো, ২.০৫ ভাগ থেকে রাতারাতি এক বছরে সেটা দাড়ায় ২৭.০৫ ভাগ। এরপর সংখ্যাটা বাড়তেই থাকে।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু আদিবাসীদের যে অর্থে বাঙালী হয়ে যেতে আহবান জানিয়েছিলেন সেটারও ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এখানে মনে রাখতে হবে ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সাংসদদের গণশপথ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু একই আহবান জানিয়েছিলেন এই দেশে বসবাসরত বিহারী ও অবাঙ্গালীদের প্রতিও। তাদের বলেছিলেন আপনারা বাঙালী হয়ে যান, নিজেদের পাকিস্তানীদের মতো না ভেবে মিশে যান এ দেশের মানুষের সঙ্গে। এই মাটিকে আপন ভাবতে শিখুন, এই দেশের মানুষকে আপন ভাবতে শিখুন। তারাও আপনাদের আপন করে নেবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজা ত্রিদিব রায়ের আহবানে চাকমা গোষ্ঠীর একটা বড় অংশই পাকিস্তানকে সমর্থন করে এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সে যোগ দেয়। স্বাধীনতার পর এদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি দেওয়া হয়। বাঙালী তার স্বাধীকার লড়াইয়ে চাকমাদের এই অবস্থানকে বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখেনি। বরং ক্ষমাসূলভ চোখেই দেখেছে।

১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ধর্মীয় সম্প্রদায়,উপসম্প্রদায়, তাদের সংস্কৃত, ঐতিহ্য লালন ও বিকাশের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু পাহাড়ে অত্যাচার চালাননি। বরং তার সংবিধানে লেখা ছিলো: জনগনের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষন হইতে মুক্তি, মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ সাধন,জনগনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার, ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী , নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য করবে না। ’ পৃথক জাতিস্বত্বার স্বীকৃতি চেয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই সংবিধানে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পর তার সেই ভুল ভাঙ্গে। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন বাঙালী জাতীয়তাবাদের আওতায় তাদের নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিপন্ন হবে না। সেসময় জাতীয় প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ বেতারে চাকমা ও মারমা ভাষায় খবর পাঠ ও প্রতিবেদন প্রচার শুরু হয়েছিলো। লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন চাকমাদের ওপর যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিপীড়ণ, বৈষম্য দূরকরার জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করার শপথ নিয়ে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে পাহাড়ে কি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে সমর্থন দিয়েছিলো চাকমারা? সেবার বিজয়ী উপেন্দ্রলাল চাকমা এবং অংশু প্রু চৌধুরীর বিপরীতে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিলো এই জাতীয়তাবাদের প্রার্থী। তারপরই শুরু পাহাড়ে বাঙালী সেটলারদের আগ্রাসন। জিয়ার জানা হয়ে গিয়েছিলো পাহাড়ের জনমত।

বাঙালী জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তিই যেখানে অসাম্প্রদায়িকতা সেখানে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক একটি উপাখ্যান মাত্র। ধর্ম নিরেপক্ষতা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে সকল অমুসলিম নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণীর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই জাতীয়তাবাদে যে কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় আনুগত্য মেনে নিলেই এই দেশের নাগরিক হতে পারবেন (যেমন গোলাম আযম),তাকে বাঙালী হতে হবে না। ভাষা, সংস্কৃতি, নৃতাত্বিক যোগসূত্রে প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ জাতিস্বত্বাকে অস্বীকার করেও আপনি এই দেশের নাগরিক হতে পারবেন, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে অংশ নিতে পারবেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসনে এর চেয়ে চমৎকার সংশোধনী আর কি হতে পারে সংবিধানের! অন্য দেশের দালালী করতে আর কি অজুহাত চাই আপনার? এটা রাষ্ট্র আপনার জন্য নিপাতনে সিদ্ধ করে দিয়েছে।

বাঙালী জাতীয়তাবাদ একটি জাতির জন্য ভুখন্ড বাংলাদেশ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ একটি ভুখন্ডের জনগনকে সেই ভুখন্ডের নামে পরিচিত করেছে। যেমন পাকিস্তানী। তারই আদলে। নতুন শ্লোগানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। ‘জয় বাংলা’কে এত ভয় কেনো বুঝতে হবে।বাঙালী হলেই যে জাতিস্মরের মতো মনে পড়ে যাবে তার সব কিছু। ভেঙ্গে যাবে শাদ্দাদের মিথ্যা বেহেশত। বিপদের কথা, সে দিনটা অত্যাসন্ন।


আরও পড়তে পারো:

১. এত মিথ্যাচারেও নত নন জাতির পিতা

http://www.amarblog.com/omipial/posts/113689

২. বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা : কিছু দালিলিক চিত্র ও প্রাসঙ্গিক গল্প
http://www.amarblog.com/omipial/posts/111505

৩. ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা : এই ম্যাতকারে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই
http://www.amarblog.com/omipial/posts/112453

৪. শেখ মুজিবের নির্বাচিত বক্তৃতা ও ধর্ম নিরপেক্ষতা
http://www.amarblog.com/omipial/posts/100642

৫. দ্বিতীয় বিপ্লব বা বাকশাল : শুনুন বঙ্গবন্ধূর মুখেই
http://www.amarblog.com/omipial/posts/101959

৬. একটা নতুন জুজু খোজো

http://www.amarblog.com/omipial/posts/148065

৭. সেই দিন আর নাইরে মামু, ক'বি বাঙালীর মাথায় কাঠাল ভাইঙ্গা খামু…
http://www.amarblog.com/omipial/posts/156056

৮. আর কত মিথ্যাচার!
http://www.amarblog.com/omipial/posts/152109

৯. কোন পিরিতির গল্প কইতেছো মামুরা!!!!

http://www.amarblog.com/omipial/posts/155897

১০. একাত্তরে ৫৫ বুদ্ধিজীবির বিবৃতি : এ নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের গল্প
http://www.amarblog.com/omipial/posts/77726

১১. মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন এবং উত্তর
https://www.facebook.com/notes/omi-rahman-pial/%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%9B%E0%A7%81-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%A8-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%89%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0/511192015571200

১২. ডেথ অব আ জিনিয়াস

http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/28734096

১৩. শিবিরের হেডকোয়ার্টারও কইলাম পাকিস্তানেই

http://www.amarblog.com/omipial/posts/142171

১৪. বিভ্রান্তির জবাব : দুটো ভিডিও

http://www.amarblog.com/omipial/posts/149964

১৫. খোকার গল্প (আমরা যাকে শেখ মুজিব নামে চিনি) : তার বাবা-মায়ের মুখে

http://www.amarblog.com/omipial/posts/102187

১৬. আন্তর্জালে জামাত-শিবির : স্বাধীনতাবিরোধী প্রচার ও প্রতিরোধের চার বছর

http://www.amarblog.com/omipial/posts/94948

১৭. ছাগুদের সেকাল ও একাল : একটি সচিত্র প্রতিবেদন
http://www.amarblog.com/omipial/posts/135841

১৮. একাত্তরের চিঠি : ইন্দিরা গান্ধীকে মওলানা ভাসানী

http://www.amarblog.com/omipial/posts/99814

 লেখাটি অমি রহমান পিয়াল ভাই কতৃক সংগ্রহীত।।